শ্রীনগর সরকারি কলেজের
ইতিহাস ,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি
এক নজরে

advanced divider
ঐতিহাসিক প্রাচীন জনপদ বিক্রমপুর শিক্ষা সংস্কৃতিতে অগ্রসর বহুকাল যাবৎ। ষাট এর দশকে মুন্সিগঞ্জ শহরের বাহিরে শ্রীনগরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রথম চিন্তা করেন ষোলঘর গ্রামের ভূইয়া পাড়ার অবসরপ্রাপ্ত পোস্টমাস্টার মমতাজউদ্দিন আহমেদ। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে শ্রীনগর পোষ্ট অফিসে একটি হিসাব খোলেন এবং রশিদ বই ছাপিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করে কলেজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় তার প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় খাদ্য, কৃষি ও পূর্ত মন্ত্রী এ,এইচ,এম শামস-উদ-দোহার ষোলঘর এ,কে,এস, কে উচ্চ বিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি কাজী হারুন-উর-রশিদ মানপত্রে শ্রীনগর থানায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। এর কয়েক মাস পরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী খান,এ,সবুর খান শ্রীনগর খেলার মাঠে এক জনসভায় ভাষণ দেন। সভা শেষে তিনি শ্রীনগরের পশ্চিম প্রান্তে মথুরাপাড়ার মস্তরি বাড়িতে কলেজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালীন স্থানীয় মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দ কলেজের নাম রেখেছিলেন শ্রীনগর আব্দুল মোনায়েম খান কলেজ। তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের নামে কলেজের ভিত্তি প্রস্তর ১৯৬৯ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি স্থানীয় ছাত্র জনতা তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে ভেঙ্গে চুরমার করে দেন। তারা কলেজের নতুন নামকরণ করেন শ্রীনগর শহীদ সোহরওয়ার্দী কলেজ।
১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাহতাবউদ্দিন আহমদকে চেয়ারম্যান ও তৎকালীন শ্রীনগর থানার সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) কাজী আবদুল মোতালেবকে সম্পাদক ও তৎকালীন জেলা পরিষদ সদস্য শাহ আলম (মাখন মিয়া) কে কোষাধ্যক্ষ করে নব গঠিত কমিটির মাধ্যমে শ্রীনগর কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কলেজের প্রভাষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. বি,করিমকে সভাপতি করে সাক্ষাৎকার কমিটি গঠিত হয়। তৎকালীন আর্ট গ্যালারি (বর্তমান শিল্প কলা একাডেমী) তে শিক্ষকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। কলেজের খণ্ডকালীন অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকা কলেজের তৎকালীন ইংরেজির অধ্যাপক এম,এ রশীদকে। অন্যান্যদের মধ্যে সিরাজুল হক (বাংলা),একেএম ওয়ালিউল ইসলাম খান (ইতিহাস),আঃ রউফ খান (পৌরনীতি),আকতারুজ্জামান (তর্কবিদ্যা) ও মোঃ সুলতান মিয়া (বাণিজ্য) কে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরে মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে কলেজে ছাত্র ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কলেজের জন্য মস্তুরী বাড়ির তৎকালীন মালিক সৈয়দ আবদুল মান্নান জমি দান করেন। পশ্চিম দিকে উত্তর দক্ষিণে দীর্ঘ টিনের ঘরে কলেজের কাজ শুরু হয়। কলেজের প্রথম চেয়ার, টেবিল, আলমারি ও বেঞ্চ দান করেন ষোলঘরের গাজী সিরাজুল হক (ফিরোজ গাজী)। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম,এন এ এবং এমপিএ প্রার্থী যথাক্রমে কফিলউদ্দিন চৌধুরী ও শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন কলেজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চে শ্রীনগর কলেজের ছাত্ররা ইয়াহিয়া খানের ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল বাহির করে। বিক্রমপুরে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা ১৩ মার্চ শ্রীনগর মাঠে উত্তোলন করেন শ্রীনগর কলেজের ছাত্ররা। এ সময়ে ছাত্রদের নেতৃত্ব দিতেন কলেজের প্রথম ছাত্র ও থানা ছাত্রলীগ সভাপতি মোঃ জয়নাল আবেদীন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে কলেজের ছাত্র মো. জয়নাল আবেদীন, মো. আনোয়ার হোসেন খান, সালাহউদ্দিন খান টুলু সহ অনেকে অংশ গ্রহণ করেন।।
স্বাধীনতার পরে শ্রীনগর কলেজ নব যাত্রা শুরু করে। স্বাধীন বাংলাদেশে কলেজ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের প্রথম চীফ হুইপ ও আওয়ামীলীগ নেতা শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেনকে চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম গভর্নর আ.ন.ম হামিদ উল্লাহ ,আঃ হাই খান ও শেখ আতাহার আলীকে সদস্য করে কলেজ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শ্রীনগর কলেজ তিল তিল করে গড়ে উঠে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পরে কলেজের অ্যাফিলিয়েশনের স্বার্থে খণ্ডকালীন অধ্যক্ষ এম,এ রশীদ পদত্যাগ করেন এবং ইতিহাসের প্রভাষক এ,কে,এম ওয়ালিউল ইসলাম খান কে অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আমলে দেউলভোগ গরুর হাটের হাসিলের টাকার ১০০% শ্রীনগর কলেজ ফান্ডে জমা হতো। ১৯৭২-৭৩ সালে পাসপোর্ট ফরমে গণপরিষদ সদস্যের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক থাকায় প্রতিটি ফরম প্রত্যয়নে কলেজ ফান্ডে ১০ টাকা প্রদানের প্রথা চালু ছিল। শ্রীনগর কলেজ ছাত্র সংসদের প্রথম নির্বাচন হয় ১২মে, ১৯৭২। ।
১৯৭২ সালে জুন মাসে তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ও তথ্য বেতার মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী শ্রীনগর কলেজ পরিদর্শন করেন। শিক্ষা মন্ত্রী বিজ্ঞান বিভাগ খোলার অনুমোদন দেন। বঙ্গবন্ধুর আমলে শ্রীনগর কলেজ ভারত সরকারের থেকে পাঠাগারের জন্য বই এবং বিজ্ঞানাগারের জন্য পোল্যান্ড সরকারের থেকে যন্ত্রপাতি লাভ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানাগারের জন্য যন্ত্রপাতির দাতা ছিলেন আবদুল হাই খান। ১৯৭২ সালে মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ কেন্দ্রে শ্রীনগর কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে শ্রীনগর কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা কেন্দ্রের অনুমোদন দেয় ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। ঐ বছর পরীক্ষা দিয়ে আইএসসিতে প্রথম শ্রেণি পায় সাগর কৃষ্ণ চক্রবর্তী। প্রথম ব্যাচের উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ছাত্রদের নিয়ে বি,এ ও বি,কম ক্লাস চালু করা হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩-৭৪ শিক্ষাবর্ষে শ্রীনগর কলেজে ডিগ্রীর অনুমোদন না দেওয়ায় হরগঙ্গা কলেজের মাধ্যমে ছাত্রদের ডিগ্রী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়। ১৯৮৪ সালে শ্রীনগর কলেজে ডিগ্রী পরীক্ষা কেন্দ্রের অনুমোদন দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৮৮ সালের ১৩ জানুয়ারি শ্রীনগর কলেজ জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১২ নভেম্বর শ্রীনগরে এক জনসভায় কলেজ জাতীয়করণের ঘোষণা দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ। প্রায় ১০ একর জমির উপর কলেজে বর্তমানে ত্রিতল একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, বিজ্ঞানাগার, পাঠাগার, বিজ্ঞান ভবন, অডিটোরিয়াম, বিএনসিসি, রোভার ডেন, রেঞ্জার, রেড ক্রিসেন্ট, শহীদ মিনার ও ছাত্রাবাসসহ কর্মচারীদের আবাসন রয়েছে। ১৯৯১-২০০০ পর্বে তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সংসদ উপনেতা অধ্যাপক এ,কিউ,এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী কলেজের ত্রিতল একাডেমিক ভবন নির্মানে অবদান রাখেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে কলেজে বাংলা ও হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে সম্মান কোর্স চালুর অনুমোদন দেয়। এ ব্যাপারে আন্তরিক সহায়তা করেন মুন্সিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য (২০০৮-২০১৯) বাবু সুকুমার রঞ্জন ঘোষ।
Shopping Basket