বিএনসিসি: শ্রীনগর সরকারি কলেজ প্লাটুন

বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) তরুন শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এই সংগঠনটি যুব সমাজকে দেশের কল্যাণে মানুষের সেবায় ব্যবহারের এক মহতী লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। “The Volunteers” বা স্বেচ্ছাসেবক এই বাণীতে উজ্জীবিত এবং জ্ঞান ও শৃঙ্খলার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বিএসসিসি সকল ক্যাডেট তাদের মাঝে আত্মোন্নয়নের মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ক্যাডেটদের মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে শারীরিক, মানসিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণবলি অর্জনের মধ্যে নিয়ে সক্ষম, কর্মঠ ও উদ্যমী জাতি গঠনের পাশাপাশি যুব সমাজের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়নতা ও সমাজ সেবার মনোভাব তৈরি করতে বিএনসিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

দেশ ও জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের অংশ গ্রহণের একটি সরকারি সংগঠন হিসেবে বিএনসিসি সর্বপ্রথম ১৯২০ সালে University Cadet Corps (UCC) নামে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ১৯২৩ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষে Indian Territorial Forces Act (ITA) পাশ হলেUniversity Training Corps (UTC নামে এই ক্যাডেট কোরের কার্যক্রম চালু হয়। পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে University officer Training Corps (UOTC) নামকরণ করা হয়। যা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে এর কার্যক্রমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত কলেজগুলোতে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে কলেজ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ১৯৬৬ সালে Junior Cadet Corps (JCC) গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালে অসীম সাহসীকতার সহিত UOTC- এর সদস্যবৃন্দ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং কোরের গৌরব ও ঐতিহ্য সমুন্নত রেখে দেশের স্বাধীনতায় এক গৌরবময় ভ‚মিকা পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে এ কোর পুনঃঅনুমোদন লাভ করে এবং Bangladesh Cadet Corps (BCC) নামে স্কুল পর্যায়ে এর কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়। এরপর ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ এক সরকারি আদেশে তৎকালীন  UOTC, BCC, JCC  একত্রে Bangladesh National Cadet Corps (BNCC) গঠন করে। এরপর ২০১৫ সালে মহান জাতীয় সংসদে Bangladesh National Cadet Corps Act উত্থাপিত হয় এবং ২০১৬ সালে এটি সংসদে পাশ হলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন দেন। বর্তমানে এই আইনের দ্বারাই একটি পরিপূর্ণ সংগঠন হিসেবে BNCC নতুন আঙ্গিকে বিস্তৃত পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

BNCC গঠন করার অব্যবহিত পরেই প্রতিটি থানার একটি কলেজ ও একটি স্কুলকে সংগঠনের আওতায় আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংগঠনটির প্রথম প্লাটুন হিসেবে ১৯৮৫ সালে পিইউ ও মোঃ দেওয়ান আলী ও পিইউ ও রেজওয়ানা আক্তার চৌধুরীর নেতৃত্বে শ্রীনগর সরকারি কলেজ বিএনসিসি প্লাটুনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে বিএনসিসি সদরদপ্তর এর ৫টি আর্মি রেজিমেন্টের অন্যতম রেজিমেন্ট, রমনা রেজিমেন্টের আওতাধীন ২ বিএনসিসি ব্যাটালিয়নের সি কোম্পানির সদরদপ্তর হিসেবে এ প্লাটুন তার কার্যক্রম পরিচালনা করে এসেছে যা বর্তমানে ডি কোম্পানিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতি বছর ক্যাডেট ভর্তি নীতিমালা অনুসরণ করে দুটি প্লাটুনে (পুরুষ প্লাটুন ৩১জন এবং মহিলা ৩১ জন) সর্বমোট ৬২ জন ক্যাডেট উচ্চ মাধ্যমিক ও সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে লিখিত পরীক্ষা, শারীরিক পরীক্ষা ও মৌখিক সাক্ষাৎকার প্রহণের মাধ্যমে এবং অন্যান্য কো-কারিকুলাম কার্যক্রমে পারদর্শীদের প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীকালে প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত ক্যাডেটদের মধ্য হতে ২ বিএনসিসি ব্যাটালিয়নের সম্মানিত অ্যাডজুটেন্ট নিজে উপস্থিত থেকে যোগ্য এবং চৌকস ক্যাডেট নির্বাচন করেন। এ প্লাটুনে নির্বাচিত ক্যাডেটদেরকে নিয়মিত সপ্তাহে ২ দিন (মঙ্গলবার ও বুধবার) সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষন কার্যক্রমে প্লাটুন কমান্ডার, সামরিক প্রশিক্ষক ও সিনিয়র ক্যাডেটরা উপস্থিত থাকেন। ক্যাডেটদের টার্ন-আউট, বিয়ারিং, ড্রিল, ইংরেজি কথোপকথন, ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, ট্রেনিং শেষে নাস্তা, নিয়মিত খেলাধুলা ও সংগীতর্চ্চা, সাধারণ জ্ঞান, বইপড়া, কুইজ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন ক্যাডেট হিসেবে বিনামূল্যে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ, বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ, শীতকালীন যৌথ মোহড়া, কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্যাম্পিং এ অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা, নেপাল, এবং মালদ্বীপে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ, সামরিক বাহিনীতে কমিশন অফিসার হিসেবে যোগদানের ক্ষেত্রে সরাসরি “আইএসএসবি” পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগদানে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান, রেডিও ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, প্রাথমিক চিকিৎসা, ফায়ার ফাইটিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ, সুবিধা পেয়ে থাকে। কলেজের অভ্যান্তরীণ বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিভিন্ন জাতীয় দিবস অনুষ্ঠানে ক্যাডেটরা সুশৃঙ্খল ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকে। এছাড়াও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সভা, সেমিনার, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপন, মশানিধন, জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা মুখি কর্মকান্ডে ক্যাডেটরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে।

ক্যাডেটরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্যাম্প ও অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করে থাকে। অক্টোবর ২৪ থেকে অক্টোবর ২৭ তারিক ২০২১ সালের ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পিং এ আর্মি পিইউও জাকারিয়া কাইউম এবং ১৭ জন ক্যাডেট অংশগ্রহণ করে। ক্যাম্পে একমাত্র প্রতিযোগিতা ফায়ারিং অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ক্যাডেট LCPL মোঃ রিফাত খান তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মালদ্বীপ এবং ভারত থেকে আগত ক্যাডেটদের নিয়ে আয়োজন করা হয় একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার। যেখানে পুরো রমনা রেজিমেন্ট এর মধ্যে শ্রীনগর সরকারি কলেজের ক্যাডেট LCPLমোঃ শামীম হোসেন একমাত্র ছেলে নৃত্যকার হিসেবে অংশগ্রহণ করে। দীর্ঘ সময়পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ইঘঈঈ ক্যাডেটদের অংশগ্রহণে ০২-০১-২০২২ সালে শুরু হয় শীতকালীন মোহড়া যা শেষ হয় ১৩-০১-২০২২ সালে। উক্ত শীতকালীন মোহড়ায় শ্রীনগর সরকারি কলেজের ৫ জন ক্যাডেট অংশগ্রহণ করে এদের ভিতরে ৪ জন ক্যাডেট সশস্ত্র বাহিনীর সেনা উইং এর ১২ ইঞ্জিনিয়ার্স এর সাথে এবং ১ জন ইফেন্ট্রি কোর এর সাথে অংশগ্রহণ করে। বিএসসিসি একাডেমি (বাইপাইল, ঢাকায় অবস্থিত) অনুষ্ঠিত রেজিমেন্টাল ক্যাম্পিং যা শুরু হয় ০৭-০৩-২০২১ এ শ্রীনগর সরকারি কলেজের ৪ জন ক্যাডেট অংশগ্রহণ করেন। এবং রমনা রেজিমেন্ট এর ২ ব্যাটালিয়ান এর ড্রিল প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করেন Sergent প্রিয়ন্তি আক্তার ও CPL মোঃ রাতুল ইসলাম তমাল। উক্ত প্রতিযোগিতায় ২ বিএসসিসি ব্যাটালিয়ন রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ক্যাম্পে শ্রীনগর সরকারি কলেজের একক প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন ক্যাডেট সার্জেন্ট সিফাত মৃধা। ক্যাম্পে তিনি রেজিমেন্টাল কোয়ার্টার মাস্টার সার্জেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন। এবং সফলতার সাথে সেন্ট্রাল ক্যাম্প সমাপ্ত করে।

একটি প্লাটুনের ক্যাডেটদের মধ্যে মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন হলো সবচেয়ে সফল কর্ম এই প্লাটুনের সকল ক্যাডেটদের মধ্যে এই গুণগুলো দেখা যায়। তই প্লাটুনের ক্যাডেটদের মধ্যে থেকে ল্যান্স কর্পোরাল, কর্পোরাল, সার্জেন্ট ও ক্যাডেট আন্ডার অফিসার হিসেবে যারা দায়িত্ব প্রাপ্ত হন তাদের তুমুল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পদগুলি অর্জন করতে হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শ্রীনগর সরকারি কলেজ বিএনসিসি প্লাটুন থেকে এ পর্যন্ত ১৬ জন ক্যাডেট আন্ডার অফিসার (ক্যাডেট থাকাকালীন সর্বোচ্চ পদোন্নতি প্রাপ্ত পদবী) পদে পদোন্নতি লাভ করেন। যা এই প্লাটুনের স্বমহিমারই একটি বহিঃপ্রকাশ। প্লাটুনের সাফল্যের মুকুটে আরেকটি সম্মান জন অর্জন বয়ে নিয়ে আসেন ২০১৬ সালে তৎকালীন প্লাটুন কমান্ডার পিইউও মোহাম্মদ আলী স্যার। ঐ বছর তিনি Bangladesh Teritorial Force Officer (BTFO) হিসেবে সেকেন্ড ল্যাফটেনেন্ট পদমর্যাদায় পদোন্নতি লাভ করেন। প্রতিবছরই এই প্লাটুনের ক্যাডেটরা তাদের যোগ্যতা দ্বারা জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সৈনিক ও অফিসার পদে। অংশগ্রহণ করছে জাতীয় প্যারেড স্কোয়ার, ঢাকা অনুষ্ঠিত বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় শিশু কিশোর দিবস ও স্বাধীনতা দিবস কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করেছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত “লাখো কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা” অনুষ্ঠানে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই প্লাটুনের ক্যাডেটরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে তাদের মেধা ও কর্মদক্ষতা দ্বারা প্রতিষ্ঠানের জন্য বয়ে এনেছে গৌরব ও সম্মান এবং অর্জন করেছে অসংখ্য পুরস্কার। অর্জন করে নিচ্ছে কলেজ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ পুরস্কার। এই ধারাবাহিকতায় উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি প্লাটুন, শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি দল, শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি ক্যাডেট, শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি শিক্ষক ও ২০১৮ এবং ২০২১ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি প্লাটুন হিসেবে শ্রীনগর সরকারি কলেজ বিএনসিসি প্লাটুনকে পুরস্কৃত করা হয়।
এই অর্জন প্লাটুনের সাথে সম্পৃক্ত কলেজের অভিভাবক অধ্যক্ষ মহোদয়, উপাধ্যক্ষ মহোদয়, পিইউও, সিইউও সকল ক্যাডেট, ২ বিএনসিসি ব্যাটালিয়ন, রমনা রেজিমেন্ট, বিএনসিসি সদরদপ্তর সার্কলের এই অর্জনের ধারা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকুক এই কামনা করি।
পরিশেষে বলতে চাই  “BNCC is Purely a Voluntary Organization”.
পিইউও জাকারিয়া কাইউম, সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, শ্রীনগর সরকারি কলেজ

ফটো গ্যালারি